আটলান্টিসের শেষ চাবি

সাথে সাথে লোকটার হেলমেটের ভেতর জল ঢুকতে শুরু করল। সে নীলকান্তর পা ছেড়ে দিয়ে নিজের গলা চেপে ধরে ছটফট করতে লাগল। নীলকান্ত আর পিছন ফিরে তাকালেন না। তিনি নিজের সমস্ত শক্তি এক করে জলের ওপর মাথা তুললেন।

ওপরের পৃথিবী তখন এক নরককুণ্ড। আকাশে মেঘের গর্জন, আর সমুদ্রের বুকে ‘দ্য সি-গাল’ জাহাজটি জ্বলছে! হ্যাঁ, রেড সার্পেন্টের অন্য দল সমুদ্রের ওপরে জাহাজে আক্রমণ করেছে। পুরো ডেকের ওপর আগুন জ্বলছে, আর ক্যাপ্টেনের লোকেরা প্রাণপণে লড়াই করছে। নীলকান্ত জাহাজের দড়ির মই ধরে ওপরে ওঠার চেষ্টা করলেন, কিন্তু ঠিক তখনই জাহাজের রেলিংয়ে এসে দাঁড়াল এক বিশালদেহী মানুষ। তার হাতে একটি রাইফেল, আর মুখে এক কুৎসিত ক্ষতচিহ্ন। সে সোজা নীলকান্তর কপালে রাইফেলটি তাক করল।

রাইফেলের কালো নলটা যখন নীলকান্তর কপালের ঠিক মাঝবরাবর স্থির হলো, তখন সমুদ্রের নোনা জল আর নিজের ক্ষতবিক্ষত পায়ের রক্ত মিশে একাকার হয়ে গেছে। ঝড়ের তীব্র ঝাপটায় জাহাজের দড়ির মইটা পেন্ডুলামের মতো দুলছে। আকাশে মেঘের এমন গর্জন যে কান পাতা দায়। রাইফেলধারী লোকটার ঠোঁটের কোণে এক ক্রূর হাসি ফুটে উঠল। সে ট্রিগারে আঙুল চাপতে যাবে, ঠিক তখনই জাহাজের পেছনের অংশ থেকে একটা জ্বলন্ত কাঠের তক্তা ভেঙে পড়ল তার ঠিক ঘাড়ে। ‘আহ্!’ করে একটা আর্তনাদ ছিটকে এল লোকটার মুখ থেকে, হাত থেকে রাইফেলটা ফসকে পড়ে গেল উত্তাল সমুদ্রের বুকে।

নীলকান্ত এই সুযোগ হাতছাড়া করলেন না। সমস্ত শক্তি এক করে তিনি দড়ি বেয়ে তরতর করে ডেকের ওপর উঠে এলেন। ডেক জুড়ে তখন নরক গুলজার। ‘দ্য সি-গাল’-এর নাবিকেরা হাতাহাতি লড়াই করছে একদল মুখোশধারী জলদস্যুর সাথে। এরা আর কেউ নয়, রেড সার্পেন্টের ভাড়াটে গুন্ডা। ক্যাপ্টেন জন একহাতে নিজের ভারী পিস্তল আর অন্যহাতে একটা লোহার রড নিয়ে তিন-চারজনকে একসাথে ঠেকিয়ে রেখেছেন। কিন্তু শত্রুসংখ্যা অনেক বেশি। বৃষ্টি আর গরমের ভাপসা আবহাওয়ায় পুরো ডেকটা চটচটে রক্ত আর বারুদের গন্ধে ভারী হয়ে উঠেছে।

“নীলকান্ত! তুমি বেঁচে আছ!” দূর থেকে চিৎকার করে উঠলেন ক্যাপ্টেন জন। কিন্তু তাঁর সেই আনন্দের স্থায়িত্ব হলো মাত্র কয়েক সেকেন্ড। পেছন থেকে একজন জলদস্যু ধারালো তলোয়ার দিয়ে ক্যাপ্টেনের পিঠে আঘাত করল। ক্যাপ্টেন জন মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। নীলকান্তর চোখের সামনে যেন আগুন জ্বলে উঠল। জন শুধু তাঁর ক্যাপ্টেন ছিলেন না, ছিলেন তাঁর বিপদের দিনের একমাত্র বিশ্বস্ত বন্ধু।

নীলকান্ত নিজের ভেজা ওয়াটারপ্রুফ ব্যাগটা শক্ত করে পিঠে বেঁধে নিলেন। তারপর ডেকের ওপর পড়ে থাকা একটা জলদস্যুর কুঠার কুড়িয়ে নিলেন। তাঁর ভেতরের আদিম শিকারি সত্তাটা এবার জেগে উঠেছে। পায়ে তীব্র যন্ত্রণা, কিন্তু অ্যাডভেঞ্চারের সেই চেনা উন্মাদনা তাঁর স্নায়ুকে অবশ করে দিয়েছে। তিনি বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়লেন ক্যাপ্টেনের হত্যাকারীর ওপর। কুঠারের এক কোপে লোকটার হাতের অস্ত্র ছিটকে গেল, পরের আঘাতে সে ডেক থেকে সোজা গিয়ে পড়ল ফুটন্ত তেলের কড়াইয়ের মতো উত্তাল সমুদ্রে।

কিন্তু পরিস্থিতি ক্রমশ হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। জাহাজের ইঞ্জিন রুমে ইতিমধ্যেই আগুন লেগে গেছে। কালো ধোঁয়ায় চারপাশ অন্ধকার। এর মাঝেই নীলকান্ত লক্ষ্য করলেন, চার-পাঁচজন মুখোশধারী জলদস্যু তাঁকে ঘিরে ফেলেছে। তাদের সবার চোখ নীলকান্তর পিঠের ব্যাগটার দিকে। তারা জানে, ওই ব্যাগের ভেতরেই আছে সেই অমূল্য গোলক।

আপনার মন্তব্য জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top