আটলান্টিসের শেষ চাবি

তিনি চারদিকে তাকালেন। এটা একটা অজানা, জনমানবহীন দ্বীপ। দ্বীপের একদিকে যতদূর চোখ যায় শুধু মাইলের পর মাইল বিস্তৃত ধূসর বালি, আর অন্যদিকে শুরু হয়েছে এক ঘন, দুর্ভেদ্য ক্রান্তীয় জঙ্গল। সেই জঙ্গল থেকে ভেসে আসছে নানারকম অচেনা পশুপাখির ডাক আর এক রহস্যময় নিস্তব্ধতা। গাছপালাগুলো এতটাই ঘন যে সূর্যের আলো সেখানে পৌঁছাতে পারছে না।

“তবে কি জলঘূর্ণির ভেতর সেই হাতগুলো মানুষের ছিল না?” নীলকান্ত স্বগতকণ্ঠেই বলে উঠলেন। ১৮৮০ সালের এই দিনলিপিতে এমন অনেক দ্বীপের কথা লেখা আছে, যা চেনা পৃথিবীর মানচিত্রে নেই। এই দ্বীপটি তেমনই এক আদিম ভূমি।

তিনি একটা ভাঙা গাছের ডাল কুড়িয়ে নিলেন লাঠি হিসেবে ব্যবহার করার জন্য। ভর দিয়ে দাঁড়াতেই শরীরটা কেঁপে উঠল। কিন্তু এখানে বসে থাকা মানে নিশ্চিত মৃত্যু। জোয়ারের জল বাড়তে শুরু করেছে, আর সমুদ্রের দিকে তাকাতেই নীলকান্তর বুকটা ধক করে উঠল। বহুদূরে, সমুদ্রের নীল দিগন্তে একটা কালো বিন্দুর মতো কিছু দেখা যাচ্ছে। ওটা কোনো সাধারণ জাহাজ নয়, ওটা সেই রেড সার্পেন্টের সাবমেরিনের পেরিস্কোপ হতে পারে! তারা চাবির খোঁজে এই দ্বীপের দিকেই আসছে।

নীলকান্ত জঙ্গলের দিকে মুখ ফেরালেন। বেঁচে থাকতে হলে এবং চাবিটি রক্ষা করতে হলে এই অজানা বন্য নরকেই তাঁকে আশ্রয় নিতে হবে। তিনি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে জঙ্গলের ভেতরে পা রাখলেন।

জঙ্গলে ঢোকার সাথে সাথে বাইরের গরম আরও কয়েকগুণ বেড়ে গেল। চারপাশের বড় বড় ফার্ন আর পরজীবী লতাগাছগুলো যেন জ্যান্ত অজগরের মতো ঝুলে আছে। পায়ের নিচে স্যাঁতসেঁতে নরম মাটি আর পচা পাতার গন্ধ। প্রতিটা পদক্ষেপে ভয়। হঠাৎ তাঁর মাথার ওপর থেকে একটা তীব্র হিসহিস শব্দ ভেসে এল। নীলকান্ত চট করে মাথা তুললেন। মাত্র দুই ফুট ওপরে একটা বিশাল সবুজ রঙের সাপ ফণা তুলে ধরেছে, যার চোখ দুটো জবা ফুলের মতো লাল।

নীলকান্ত স্থির হয়ে গেলেন। এই মুহূর্তে সামান্য নড়াচড়া মানেই সাপের কামড়। তিনি বুক ভরে শ্বাস নিলেন এবং নিজের হাতের লাঠিটা আস্তে আস্তে সাপের চোখের সামনে দোলাতে লাগলেন। সাপটা লাঠির গতিবিধি লক্ষ্য করতে করতে একসময় অন্যমনস্ক হতেই নীলকান্ত বিদ্যুৎগতিতে এক পা পিছিয়ে গেলেন। সাপটা ফোঁস করে কামড় মারল শূন্যে, কিন্তু ততক্ষণে নীলকান্ত তার নাগালের বাইরে চলে গেছেন।

কিন্তু বিপদ সেখানেই শেষ নয়। জঙ্গলটি যত গভীর হচ্ছে, চারপাশের পরিবেশ তত বেশি ভৌতিক হয়ে উঠছে। প্রাচীন বড় বড় গাছের গায়ে খোদাই করা আছে কিছু অদ্ভুত চিহ্ন—ঠিক যেমনটা তিনি সমুদ্রের তলার সেই ধ্বংসাবশেষে দেখেছিলেন! তার মানে এই দ্বীপের সাথে আটলান্টিসের কোনো গভীর সংযোগ আছে।

হঠাৎ করেই নীলকান্তর মনে হলো, কেউ একজন তাঁর পিছু নিয়েছে। পেছনের শুকনো পাতা মচমচ করে ওঠার শব্দ স্পষ্ট। তিনি একটা বিশাল বটগাছের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে ফেললেন এবং হাতের ডালটা শক্ত করে ধরলেন।

শব্দটা ক্রমশ এগিয়ে আসছে। ভারী কোনো প্রাণীর নয়, মানুষের মতোই হালকা কিন্তু দ্রুত পায়ের শব্দ। ঝোপঝাড় ঠেলে একটা অবয়ব সামনে বেরিয়ে এল। বুনো লতাপাতা দিয়ে তৈরি পোশাক, গায়ে অদ্ভুত উল্কি আঁকা। কিন্তু তার হাতে কোনো ধনুক বা বল্লম নেই, তার বদলে আছে একটা ভারী ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর রাইফেল! লোকটা মুখ ফেরাতেই নীলকান্ত স্তব্ধ হয়ে গেলেন।

আপনার মন্তব্য জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top