আটলান্টিসের শেষ চাবি

তিনি কষ্টেসৃষ্টে উঠে বসার চেষ্টা করলেন। ভাঙা হাতটার যন্ত্রণায় তাঁর মুখ বিকৃত হয়ে গেল। কিন্তু চারদিকের দৃশ্য দেখে তিনি নিজের সব কষ্ট ভুলে গেলেন। তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক আদিম, অবিনশ্বর নগরী। এটাই কিংবদন্তির হারানো শহর আটলান্টিসের মূল পাতালপুরী!

চারপাশে বিশাল বিশাল স্ফটিকের তৈরি স্তম্ভ, যা থেকে এক মায়াবী নীল এবং বেগুনী আলো বিচ্ছুরিত হয়ে পুরো নগরীকে আলোকিত করে রেখেছে। কোনো মানুষের তৈরি স্থাপত্যের সাথে এর মিল নেই। বাড়িগুলো জ্যামিতিক নিখুঁত বৃত্তাকার এবং উপবৃত্তাকার নকশায় তৈরি, যা শত শত বছর ধরে জলের নিচে থাকার পরও একটুও ক্ষয়ে যায়নি। চারদিকের বাতাস অদ্ভুত রকমের তাজা এবং তাতে লোহা ও সমুদ্রের লবণের এক মিশ্র গন্ধ।

নীলকান্ত নিজের পিঠের ব্যাগটার দিকে তাকালেন। ওয়াটারপ্রুফ ব্যাগটা ছিঁড়ে গেছে, কিন্তু অলৌকিকভাবে সেই নীলকান্তমণি গোলকটি তাঁর কোমরঘেঁষা পকেটেই আটকে আছে। তবে গোলকটি এখন আর আগের মতো শান্ত নেই। এর ভেতরের খাঁজগুলো অবিরামভাবে ঘুরছে আর এক মৃদু গুঞ্জন তৈরি করছে, যেন সেটি এই পাতালপুরীর মূল হৃদপিণ্ডের সাথে কোনো এক অদৃশ্য তারে বাঁধা।

“কে? কে এলে আমাদের শেষ তোরণে?”

এক গম্ভীর, ধাতব কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হলো পুরো প্রাসাদ জুড়ে। শব্দটা কোনো একটা নির্দিষ্ট দিক থেকে আসছে না, মনে হচ্ছে চারপাশের স্ফটিক দেয়ালগুলোই কথা বলে উঠছে। নীলকান্ত বিদ্যুৎগতিতে নিজের সুস্থ হাত দিয়ে ছোরাটি বের করে বুক চিতিয়ে দাঁড়ালেন। “আমি নীলকান্ত। ভারত মহাসাগরের এক ডুবুরি। আমি কোনো শত্রু নই।”

স্ফটিক স্তম্ভগুলোর আড়াল থেকে ধীরে ধীরে কয়েকটি অবয়ব সামনে এগিয়ে এল। তাদের দেখে নীলকান্তর হাতের ছোরাটি প্রায় শিথিল হয়ে গেল। এরা মানুষ নয়, আবার পুরোপুরি জলজ প্রাণীও নয়। তাদের শরীর মানুষের মতোই দীর্ঘ ও সুঠাম, কিন্তু চামড়ার রঙ হালকা নীলচে এবং গলার দুপাশে মাছের মতো সূক্ষ্ম ফুলকা স্পষ্ট। তাদের চোখগুলো বড় বড় এবং সম্পূর্ণ কালো, যার ভেতর এক আদিম জ্ঞানের গভীরতা লুকিয়ে আছে। এদের পায়ের পাতাগুলো ঠিক তেমনই, যার ছাপ নীলকান্ত সেই প্রথম দ্বীপে দেখেছিলেন। এরা আটলান্টিসের শেষ বংশধর—পাতালপুরীর রক্ষী!

দলের প্রধান, যার মাথায় একটি প্রাচীন ধাতব মুকুট ছিল, সে নীলকান্তর হাতের গোলকটির দিকে তাকাল। তার কালো চোখে এক অদ্ভুত বিস্ময় ফুটে উঠল। “তুমি সেই চাবি ফিরিয়ে এনেছ, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আমাদের আদিম তোরণকে বন্দি করে রেখেছিল। কিন্তু তোমার সাথে তো এক লোভী পৃথিবীর গন্ধ মিশে আছে। প্রফেশর নামের সেই শয়তান মানুষটি কোথায়?”

“সে তার নিজের লোভের আগুনে শেষ হয়ে গেছে,” নীলকান্ত শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বললেন। “আমি এই চাবি কোনো ক্ষমতার জন্য আনিনি। আমি এসেছিলাম ইতিহাসের এক সত্যকে উদ্ধার করতে। কিন্তু এখন আমি বুঝতে পারছি, এই শক্তি চেনা পৃথিবীর মানুষের জন্য এক চরম অভিশাপ।”

রক্ষী প্রধান নীলকান্তর দিকে এক পা এগিয়ে এল। তার হাত দুটি অদ্ভুতভাবে কাঁপছে। “তুমি সত্য বলেছ, মানুষ। এই গোলকটি আমাদের সভ্যতার সমস্ত শক্তির আধার। এটি যদি ভুল হাতে পড়ে, তবে পৃথিবীর সমুদ্র শুকিয়ে যাবে, আর আকাশ লোহায় ঢেকে যাবে। কিন্তু তুমি তো জখম, তোমার শরীর মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে। এই চাবি আমাদের হাতে তুলে দাও, আমরা তোমাকে মুক্তি দেব।”

আপনার মন্তব্য জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top