আটলান্টিসের শেষ চাবি

এই বিষাক্ত কীটের কামড় খেলে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে শরীর অবশ হয়ে মরতে হবে। নীলকান্ত আর এক মুহূর্তও দ্বিধা করলেন না। তিনি পিঠের ব্যাগ থেকে দ্রুত সেই নীলকান্তমণি গোলকটি বের করে আনলেন। লণ্ঠনের আলোয় গোলকটি এক তীব্র অতিপ্রাকৃতিক নীল আভায় জ্বলে উঠল।

তিনি গোলকটি দুই হাতে শক্ত করে ধরে দরজার মাঝখানের সেই বৃত্তাকার খাঁজে চেপে ধরলেন। সাথে সাথে এক অভাবনীয় কাণ্ড ঘটল। গোলকটির ভেতরের জটিল জ্যামিতিক নকশাগুলো নিজে থেকেই ঘুরতে শুরু করল। ঠিক যেন কোনো আধুনিক লকের চাবি ঘুরছে। কয়েক সেকেন্ডের এক তীব্র যান্ত্রিক ঘড়ঘড় আওয়াজ হলো, এবং সেই বিশাল ধাতব দরজাটি মাঝখান থেকে দুভাগে ভাগ হয়ে ধীরগতিতে খুলে গেল।

নীলকান্ত ছিটকে ভেতরে ঢুকে পড়লেন এবং দরজাটি তাঁর পেছনে আবার স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে গেল। বাইরের সেই বিষাক্ত কীটের দল দরজার ওপারেই আটকে রইল।

দরজা বন্ধ হতেই ভেতরের পরিবেশ সম্পূর্ণ বদলে গেল। নীলকান্ত অবাক হয়ে দেখলেন, তিনি এক বিশাল হলঘরের মতো জায়গায় দাঁড়িয়ে আছেন। তবে জায়গাটি গুহা নয়, এটি একটি আদিম ভূগর্ভস্থ ল্যাবরেটরি বা কোনো রাজপ্রাসাদের অংশ। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এখানে কোনো লণ্ঠনের প্রয়োজন নেই। ঘরের ছাদ ও দেয়াল থেকে এক মৃদু স্ফটিকের মতো সবুজ আলো বেরোচ্ছে। হলঘরের মাঝখানে একটি বিশাল পাথরের টেবিল, আর তার ওপর বিছিয়ে রাখা আছে চামড়ার তৈরি কিছু প্রাচীন মানচিত্র এবং সমুদ্রের স্রোতের গতিবিধির হিসাব।

“চমৎকার! সত্যিই চমৎকার, নীলকান্ত! আমি জানতাম তুমি পারবে।”

এক পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনে নীলকান্ত বিদ্যুৎগতিতে ঘুরে দাঁড়ালেন। হলঘরের এক অন্ধকার কোণ থেকে একজন মানুষ ধীরে ধীরে আলোয় বেরিয়ে এল। তার পরনে দামী কোট, চোখে চশমা। লোকটিকে দেখে নীলকান্তর হাতের লণ্ঠনটা প্রায় ফসকে পড়ে যাচ্ছিল।

“প্রফেসর সেনগুপ্ত! আপনি? কিন্তু আপনি তো এক বছর আগে লোহিত সাগরে এক জাহাজডুবিতে মারা গেছেন!” নীলকান্তর গলা দিয়ে প্রায় আওয়াজ বেরোচ্ছিল না। প্রফেসর সেনগুপ্ত ছিলেন তাঁর মেন্টর, যিনি তাঁকে প্রাচীন লিপির পাঠোদ্ধার করতে শিখিয়েছিলেন।

প্রফেসর সেনগুপ্ত হাসলেন। তবে সেই হাসিতে কোনো প্রাচীন শিক্ষকের স্নেহ ছিল না, ছিল এক শয়তানি চাতুর্য। “মৃত্যুটা একটা নাটক ছিল, নীলকান্ত। এই মূর্খ চেনা পৃথিবীর মানুষ জানলে কি আমাকে শান্তিতে কাজ করতে দিত? আমিই ‘রেড সার্পেন্ট’-এর মস্তিষ্ক। আমিই ‘দ্য শ্যাডো’-র প্রধান উপদেষ্টা। লোহিত সাগরের সেই দ্বীপ থেকে শুরু করে ভারত মহাসাগরের এই তোরণ পর্যন্ত সব হিসেব আমারই করা। শুধু এই চাবিটা উদ্ধার করার জন্য একজন পাগল ও দুঃসাহসী ডুবুরির দরকার ছিল, আর সেই বোকা বলির পাঁঠাটি হলে তুমি!”

নীলকান্তর পায়ের জখমের যন্ত্রণাটা যেন এক লহমায় উধাও হয়ে গেল, তার জায়গায় ধমনিতে আগুন চড়ে বসল। “তার মানে ‘দ্য সি-গাল’ জাহাজের ওপর আক্রমণ, ক্যাপ্টেন জনের মৃত্যু—সব আপনার ছক ছিল?”

“অবশ্যই,” প্রফেসর নির্বিকারভাবে বললেন। “জন বড্ড বেশি সৎ ছিল। তাকে সরাতেই হতো। এবার লক্ষ্মী ছেলের মতো ওই নীলকান্তমণি গোলকটি আমার হাতে দিয়ে দাও। এই তোরণের নিচেই লুকিয়ে আছে আটলান্টিসের আসল শক্তি—এক আদিম পারমাণবিক উৎস, যা দিয়ে পুরো পৃথিবীর ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেওয়া যায়। আমরা লোহিত সাগরের গোপন দ্বীপে আমাদের মূল ঘাঁটি তৈরি করেছি। চাবিটা পেলেই আমাদের কাজ শেষ।”

আপনার মন্তব্য জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top