আটলান্টিসের শেষ চাবি

তিনি দ্রুত সাঁতরে সেই ভাঙা ফাটলের ভেতর নিজের মাথাটা গলিয়ে দিলেন এবং হেলমেটটা এক ঝটকায় খুলে ফেললেন। সাথে সাথে সমুদ্রের তীব্র নোনা জল তাঁর চোখে-মুখে ঢুকে পড়ল। কিন্তু অলৌকিকভাবে, সেই ফাটলের ভেতরের অবরুদ্ধ চেম্বারে কিছুটা বাতাস আটকে ছিল। নীলকান্ত হা-হা করে সেই বাতাস ফুসফুসে টেনে নিলেন। বাতাসটা বাসি আর গন্ধযুক্ত, কিন্তু এই মুহূর্তে ওটাই তাঁর জীবন।

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তাঁর চেতনা ফিরে এল। লণ্ঠনের আলোয় তিনি দেখলেন, তাঁর হাতের ওয়াটারপ্রুফ ব্যাগেই রয়েছে সেই প্রাচীন নীলকান্তমণি গোলকটি। গোলকটি থেকে এখনও এক মৃদু কম্পন অনুভূত হচ্ছে, যেন সেটি কোনো জীবন্ত হৃদপিণ্ড। কিন্তু স্বস্তির সময় নেই। বাইরে সেই কালো দানব সাবমেরিনটি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার শক্তিশালী সার্চলাইটের আলো ফাটলের ভেতর পর্যন্ত চলে আসছে। অপরাধ চক্রের লোকগুলো ভালো করেই জানে, নীলকান্ত এই ধ্বংসাবশেষের ভেতরেই কোথাও লুকিয়ে আছেন।

হঠাৎ এক বিকট আওয়াজ হলো। সাবমেরিন থেকে দুজন ডুবুরি আধুনিক ডাইভিং গিয়ার এবং হাতে আন্ডারওয়াটার হারপুন গান নিয়ে বের হয়ে এসেছে। তাদের স্যুটের বুকে সেই চেনা লাল সাপের চিহ্ন। তারা খুব দ্রুত ফাটলের দিকে এগিয়ে আসছে। নীলকান্ত বুঝলেন, এখানে আটকে থাকা মানে খাঁচায় বন্দি ইঁদুরের মতো মরা। তিনি ফাটলের অন্য প্রান্তের একটি সরু সুড়ঙ্গ দেখতে পেলেন। জাহাজটি যখন ডুবেছিল, তখন সম্ভবত এর পেছনের অংশটি ভেঙে আলাদা হয়ে গিয়েছিল।

তিনি ব্যাগটি শক্ত করে পিঠে বেঁধে সেই সরু সুড়ঙ্গ ধরে এগোতে লাগলেন। চারপাশটা এতটাই সংকীর্ণ যে তাঁর পিঠের চামড়া জাহাজের মরচে পড়া লোহার চাদরে ঘষা খেয়ে কেটে গেল। নোনা জলে ক্ষতস্থান জ্বলে উঠল তীব্র যন্ত্রণায়। কিন্তু তিনি থামলেন না। পেছনে তখন শত্রুদের লণ্ঠনের আলো স্পষ্ট হয়ে উঠছে। তারা নীলকান্তকে দেখে ফেলেছে!

‘সাঁই’ করে একটি লোহার তীর বা হারপুন তাঁর কানের পাশ দিয়ে চলে গেল। একটুর জন্য তাঁর মাথাটা এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে যায়নি। তীরটি সামনের লোহার দেয়ালে লেগে ছিটকে পড়ল। নীলকান্ত নিজের গতি আরও বাড়িয়ে দিলেন। সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে পৌঁছাতেই তিনি দেখলেন, সেটি সমুদ্রের উন্মুক্ত তলদেশে গিয়ে মিশেছে। কিন্তু সেখানে স্রোত আরও ভয়ংকর। ওপরের ঝড় সমুদ্রের নিচের জলকেও তোলপাড় করে তুলেছে।

নীলকান্ত সুড়ঙ্গ থেকে বের হয়েই ওপরের দিকে তীব্র গতিতে সাঁতরাতে লাগলেন। এবার আর কোনো ওজন নেই, তাঁর শরীরটা তীরের মতো ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছে। কিন্তু এতে আরও এক বড় বিপদ আছে। একে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘দ্য বেন্ডস’। গভীর সমুদ্র থেকে হঠাৎ করে ওপরে উঠে এলে রক্তের নাইট্রোজেন বুদবুদ তৈরি করে ধমনিতে আটকে যায়, যা পঙ্গুত্ব বা তাৎক্ষণিক মৃত্যুর কারণ হতে পারে। নীলকান্ত সেটা জানতেন, কিন্তু পেছনে ধেয়ে আসা খুনিদের হাত থেকে বাঁচতে তাঁর কাছে আর কোনো উপায় ছিল না।

তিনি যখন জলের উপরিভাগের কাছাকাছি পৌঁছালেন, তখন সমুদ্রের জলের রঙ কালো থেকে হালকা ধূসর হতে শুরু করেছে। ওপরের ঝোড়ো হাটের দাপট জলের নিচেও টের পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু হঠাৎ করেই তাঁর পায়ের কাছে এক তীব্র টান অনুভূত হলো। রেড সার্পেন্টের একজন ডুবুরি তাঁর পা টিপে ধরেছে! লোকটার চোখে নিষ্ঠুরতার হাসি। সে অন্য হাতের ধারালো ছুরিটা নীলকান্তর পায়ে বসিয়ে দেওয়ার জন্য উদ্যত হলো।

নীলকান্ত নিজের ডান পা দিয়ে লোকটার মুখে এক লাথি মারলেন। কিন্তু জলের নিচে লাথির গতি কমে গেল। লোকটা ছুরি দিয়ে নীলকান্তর পায়ের পেশি চিরে দিল। জলের মধ্যে রক্তের এক লাল স্রোত মিশে গেল। তীব্র যন্ত্রণায় নীলকান্ত চিৎকার করে উঠলেন, তাঁর মুখ থেকে শেষ বাতাসটুকু বুদবুদ হয়ে বেরিয়ে গেল। কিন্তু সেই যন্ত্রণাই যেন তাঁর ভেতরে এক আদিম শক্তি জাগিয়ে তুলল। তিনি কোমরে গোঁজা নিজের ছোরাটি বের করে বিদ্যুৎগতিতে ডুবুরির এয়ার পাইপটি কেটে দিলেন।

আপনার মন্তব্য জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top