‘ধাই!’ করে এক বিকট শব্দ হলো। বুলেটটি নীলকান্তর কানের পাশ দিয়ে চলে গিয়ে পেছনের একটি প্রাচীন পাথরের স্তম্ভে আঘাত করল। স্তম্ভের গা থেকে এক টুকরো পাথর খসে পড়ল। নীলকান্ত আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে সেই পাথরের তোরণের ভেতরের দিকে দৌড়াতে লাগলেন।
তোরণের ভেতরটা এক বিশাল সিঁড়িপথ, যা মাটির নিচে সুগভীর কোনো পাতালে নেমে গেছে। সিঁড়িগুলো সাধারণ পাথর নয়, সমুদ্রের তলদেশের সেই মসৃণ, কুচকুচে কালো ধাতু দিয়ে তৈরি। স্যাঁতসেঁতে আর্দ্র আবহাওয়া আর তীব্র গরমের ভাপসা গন্ধ এখানে আরও প্রকট। নীলকান্ত প্রতিটা ধাপ পেরিয়ে নিচে নামছেন, আর পেছনে প্রফেসরের ভারী বুটের শব্দ এবং উন্মাদ গালাগাল প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
“তুমি পালাতে পারবে না, নীলকান্ত! এই পাতালে তোমার কবর হবে! চাবিটা আমার চাই-ই চাই!” প্রফেসরের কণ্ঠস্বর ক্রমশ কাছে চলে আসছে।
সিঁড়িপথটি যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানে পৌঁছাতেই নীলকান্তর চোখ বিস্ময়ে ছানাবড়া হয়ে গেল। এটি এক বিশাল ভূগর্ভস্থ হ্রদ। হ্রদের জল সাধারণ জল নয়, তা যেন এক ফুটন্ত রূপালী পারদ। আর সেই হ্রদের মাঝখানে ভাসছে এক আদিম, বৃত্তাকার বেদি। বেদিটির ঠিক মাঝখানে একটি বড় খিলান দাঁড়িয়ে আছে, যার গায়ে খোদাই করা আছে আটলান্টিসের সেই হারিয়ে যাওয়া শহরের ত্রিমাত্রিক মানচিত্র। আর সেই খিলানের কেন্দ্রবিন্দুতে একটি গভীর গর্ত রয়েছে।
নীলকান্ত বুঝতে পারলেন, এটাই হলো আসল চাবিকাঠি। এই খিলানে গোলকটি স্থাপন করলেই উন্মোচিত হবে আটলান্টিসের মূল তোরণ, যা হয়তো সমুদ্রের তলদেশ থেকে সেই প্রাচীন শহরকে আবার ওপরে তুলে নিয়ে আসবে। কিন্তু একই সাথে, যদি এর ক্ষমতা কোনো লোভী মানুষের হাতে পড়ে, তবে পৃথিবীর ধ্বংস ডেকে আনবে।
“হাত তোলো, নীলকান্ত! খেলা শেষ!”
প্রফেসর সেনগুপ্ত সিঁড়ির শেষ ধাপে এসে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর রিভলভারের নলটা এবার সরাসরি নীলকান্তর পিঠের মাঝবরাবর স্থির। প্রফেসরের মুখে এক পৈশাচিক বিজয়ের হাসি। “অনেক দৌড়েছ। এবার গোলকটা ওই খিলানের গর্তে বসাও। আমি নিজে ওটা স্পর্শ করব। পৃথিবীর নতুন সম্রাট হব আমি!”
নীলকান্ত ধীর পায়ে খিলানের দিকে এগিয়ে গেলেন। তাঁর ডান কাঁধের ক্ষত থেকে টপ টপ করে রক্ত পড়ছে সেই রূপালী পারদের মতো জলে। তিনি গোলকটি পকেট থেকে বের করলেন। গোলকটি এখন প্রগাঢ় নীল রঙে জ্বলছে, যেন এক জ্যান্ত নক্ষত্র।
“প্রফেসর, আপনি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভুলটি করতে যাচ্ছেন। এই শক্তি মানুষের জন্য নয়,” নীলকান্ত শান্ত কণ্ঠে বললেন।
“জ্ঞান দিও না, ডুবুরি! বসাও ওটা!” প্রফেসরের আঙুল ট্রিগারে চেপে বসল।
নীলকান্ত এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তিনি গোলকটি খিলানের সেই গভীর গর্তের দিকে বাড়িয়ে দিলেন। কিন্তু গোলকটি খিলানে স্পর্শ করার ঠিক আগের মুহূর্তে, তিনি লক্ষ্য করলেন খিলানের নিচে এক প্রাচীন লিপি খোদাই করা আছে, যার অর্থ—‘কেবলমাত্র আত্মত্যাগের রক্তই এই শক্তিকে জাগাতে পারে, লোভ নয়।’