পরমুহূর্তেই এক বিকট শব্দে হলঘরের মেঝের নিচ থেকে গলগল করে সমুদ্রের কালো জল ঢুকে পড়তে লাগল। লোহিত সাগরের অভিশপ্ত স্রোত এই পাতালপুরীকে গিলে খেতে শুরু করেছে। জলস্তর দ্রুত বাড়ছে, নীলকান্তর কোমর পর্যন্ত নোনা জল ছুঁয়ে ফেলল। তিনি আর সময় নষ্ট করলেন না, সেই সরু নালাটি ধরে সাঁতরাতে শুরু করলেন। নালার ভেতর দিয়ে জলের স্রোত তীব্র বেগে প্রবাহিত হচ্ছে, যেন কোনো পাহাড়ি ঝরনা।
তিনি বুঝতে পারলেন, এটিই তাঁর একমাত্র বাঁচার পথ। নালার শেষ প্রান্তে এক চিলতে আলোর রেখা দেখা যাচ্ছে। সেটি কি সমুদ্রের উপরিভাগ? তিনি সমস্ত শক্তি দিয়ে স্রোতের বিপরীতে নিজের শরীরটাকে ঠেলে দিলেন। কাঁধের ক্ষত দিয়ে বিষাক্ত নোনা জল ঢুকছে, যন্ত্রণায় চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে আসছে। কিন্তু তিনি থামলে মৃত্যু অনিবার্য।
কিছুক্ষণ পর তিনি নালার শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছালেন। সেটি একটি গোপন ডুবোসুড়ঙ্গ, যা সরাসরি সমুদ্রের লোহিত সাগরের গভীরে গিয়ে শেষ হয়েছে। তিনি যখন জলের ওপর মাথা তুললেন, দেখলেন আকাশটা একদম অন্ধকার। লোহিত সাগরের ওপর নেমে এসেছে এক বিধ্বংসী লোহিতঝড়—বালির ঝড় আর বৃষ্টির এক সংমিশ্রণ, যার ফলে আকাশটা রক্তের মতো লাল বর্ণ ধারণ করেছে।
ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে আছে সেই প্রকাণ্ড আধুনিক ডুবোজাহাজটি। সেটি থেকে সার্চলাইটের তীব্র আলো সমুদ্রের তলদেশ তন্ন তন্ন করে খুঁজছে। তারা কি প্রফেসর আর তার দলকে উদ্ধার করার চেষ্টা করছে? না, তারা আসলে গোলকটির জন্য মরিয়া।
নীলকান্ত জলের ওপর ভাসমান অবস্থায় দেখলেন, ডুবোজাহাজের ঠিক পাশেই ভেসে উঠেছে একটি ছোট লাইফবোট। তাতে প্রফেসর সেনগুপ্ত আর দুজন দস্যু উঠে পড়ছে। তাদের পরনে বিশেষ ধরনের ডাইভিং স্যুট। প্রফেসরের চোখে তখন আর চশমা নেই, তার বদলে রয়েছে এক উন্মাদ চাহনি। তিনি চিৎকার করে বলছেন, “গোলকটি ছাড়া তোরণ খোলা সম্ভব নয়! চাবিটা ওই ছেলেটার কাছেই আছে! ওকে খুঁজুন!”
নীলকান্ত বুঝলেন, তিনি এখন পুরোপুরি অরক্ষিত। তাঁর শরীর অবশ হয়ে আসছে, কিন্তু তাঁর হাতের মুঠোটা এখনও শক্ত। তিনি ডুবোজাহাজের রাডারের নাগালের বাইরে থাকার জন্য উল্টো দিকে সাঁতরাতে লাগলেন। কিন্তু লোহিতঝড়ের দাপটে উত্তাল ঢেউ তাঁকে এক খেলনার মতো ওলটপালট করে দিচ্ছে।
হঠাৎ তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল একটি অতিকায় কালো অবয়ব। কোনো সাবমেরিন নয়, সেটি একটি বিশাল সামুদ্রিক হাঙর! লোহিত সাগরের এই গভীরতায় এই ধরণের দানবীয় হাঙর সচরাচর দেখা যায় না। হাঙরটি রক্তের গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে ঠিক তাঁর দিকেই এগিয়ে আসছে। নীলকান্ত নিজের ছোরাটি বের করলেন, কিন্তু জলের নিচে এক হাত জখম নিয়ে এই দানবের সাথে লড়াই কি সম্ভব?
হাঙরটি লেজের ঝাপটায় জল তোলপাড় করে নীলকান্তর দিকে মুখ হা করে ধেয়ে এল। ঠিক সেই মুহূর্তে, আকাশ থেকে একটি বিশাল বাজ পড়ল সমুদ্রের ঠিক মাঝখানে, যেখানে ডুবোজাহাজটি দাঁড়িয়ে ছিল। প্রকাণ্ড এক বিস্ফোরণে পুরো লোহিত সাগরের জল স্তম্ভের মতো আকাশ পর্যন্ত উঠে গেল। সেই আগুনের ঝলকানি নীলকান্তকে অন্ধ করে দিল। তিনি বুঝতে পারলেন, প্রকৃতি নিজেই আজ ধ্বংসযজ্ঞের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
আকাশচুম্বী সেই বিদ্যুৎস্পর্শ আর ডুবোজাহাজের বিস্ফোরণের অভিঘাতে সমুদ্রের জল যেন ফুটন্ত তেলের মতো টগবগ করে উঠল। প্রকাণ্ড ঢেউয়ের ধাক্কায় সেই দানবীয় হাঙরটি নীলকান্তর ওপর চড়াও হওয়ার আগেই জলের তোড়ে বহুদূরে ছিটকে গেল। বিস্ফোরণের তীব্র আলোয় লোহিত সাগরের লালচে জল এক মায়াবী ও ভয়ানক রূপ ধারণ করেছে। নীলকান্ত নিজের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে একটি ভাসমান কাঠের তক্তা আঁকড়ে ধরলেন। তাঁর ডান