“প্রফেসর, আপনি বিজ্ঞানকে ক্ষমতার লোভের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন। এই চাবি আমি আপনাকে দেব না,” নীলকান্ত শান্ত কণ্ঠে বললেন।
“তবে তাই হোক!” প্রফেসর রিভলভারের ঘোড়া টানলেন।
ঠিক সেই মুহূর্তে, দ্বীপের কালো মাটির নিচ থেকে এক তীব্র কাঁপন শুরু হলো। কোনো সাধারণ ভূমিকম্প নয়, চারপাশের প্রাচীন জাহাজের কঙ্কালগুলো নিজে থেকেই নড়াচড়া করতে শুরু করল। মরচে পড়া লোহার চাদরগুলো তীব্র শব্দে কাঁপছে। আর সেই সাথে, জাহাজের ভাঙা কেবিনগুলো থেকে বের হতে শুরু করল এক অদ্ভুত কুয়াশা, যা মানুষের অবয়ব ধারণ করছে। প্রেতপুরীর সেই অভিশপ্ত অতৃপ্ত আত্মারা যেন জেগে উঠেছে প্রফেসরের লোভের কর্কশ শব্দে!
কুয়াশার সেই অবয়বগুলো তীব্র গতিতে প্রফেসরের দিকে ধেয়ে যেতে লাগল। প্রফেসর ভয় পেয়ে উল্টো দিকে গুলি চালাতে শুরু করলেন, কিন্তু বুলেট সেই কুয়াশাকে ভেদ করে চলে গেল। তিনি আর্তনাদ করে পেছনের দিকে দৌড়াতে লাগলেন। নীলকান্ত এই সুযোগে নিজের ব্যাগটা চেপে ধরে দ্বীপের ভেতরের দিকে থাকা একটি প্রাচীন পাথরের তোরণের দিকে ছুটলেন।
কিন্তু কুয়াশার একটি অংশ হঠাৎ করেই নীলকান্তর পথ আটকে দাঁড়াল। তার ভেতর থেকে দুটো জ্বলন্ত লাল চোখ নীলকান্তর দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকাল, আর এক তীব্র হিমশীতল হাওয়া নীলকান্তর পুরো শরীরকে অবশ করে দিল।
কুয়াশার সেই হিমশীতল অবয়বটি যখন নীলকান্তর বুকের ওপর চেপে বসল, তখন তাঁর মনে হলো হৃদপিণ্ডের রক্ত চলাচল বুঝি চিরতরে থমকে যাবে। শরীরের তাপমাত্রা ঝপ করে নেমে গেল শূন্যের নিচে। লাল চোখ দুটো তাঁর আত্মার ভেতর পর্যন্ত দেখছে। কিন্তু ঠিক তখনই এক অলৌকিক কাণ্ড ঘটল। নীলকান্তর বুকপকেটে থাকা সেই প্রাচীন নীলকান্তমণি গোলকটি হঠাৎ তীব্র বেগে কাঁপতে শুরু করল। গোলকটির গা থেকে এক অতিপ্রাকৃতিক, প্রখর নীল আলোর বিচ্ছুরণ ঘটল, যা কুয়াশার সেই অন্ধকার রূপকে চিরে ফেলল।
একটি তীব্র আর্তনাদের শব্দ প্রতিধ্বনিত হলো প্রেতপুরীর আকাশে, আর পরমুহূর্তেই কুয়াশার সেই ভৌতিক অবয়বটি কর্পূরের মতো বাতাসে মিলিয়ে গেল। শুধু তাই নয়, পুরো দ্বীপ জুড়ে যে কুয়াশার তান্ডব চলছিল, তা এই নীল আলোর স্পর্শে শান্ত হতে শুরু করল। নীলকান্ত হাঁফাতে হাঁফাতে মাটিতে বসে পড়লেন। তিনি বুঝলেন, এই গোলকটি শুধু আটলান্টিসের প্রবেশদ্বারের চাবিই নয়, এটি আসলে এক আদিম শক্তির উৎস, যা এই দ্বীপের সমস্ত অপশক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে।
“ওটা… ওটা আমাকে দাও!”
দূর থেকে এক পৈশাচিক চিৎকার ভেসে এল। নীলকান্ত তাকিয়ে দেখলেন, প্রফেসর সেনগুপ্ত লতার সাথে কুস্তি লড়ে কোনোমতে কুয়াশার হাত থেকে বেঁচে ফিরেছেন। তাঁর জামাকাপড় ছিন্নভিন্ন, শরীর থেকে ঝরছে রক্ত। কিন্তু তাঁর চোখের সেই আদিম লোভ একটুও কমেনি। তিনি নিজের ভারী রিভলভারটি দুহাতে শক্ত করে ধরে নীলকান্তর দিকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়লেন।