এ তো কোনো আদিবাসী নয়! লোকটার মুখে সেই কুৎসিত ক্ষতচিহ্ন। এটা ‘দ্য সি-গাল’ জাহাজের সেই জলদস্যু, যে তাঁর কপালে রাইফেল তাক করেছিল! সে কীভাবে এই দ্বীপে এল?
লোকটা একহাতে রাইফেল ধরে চারদিকে তাকাচ্ছে, আর তার অন্যহাতে একটা আধুনিক ওয়ারলেস সিগন্যালিং ডিভাইস, যা দিয়ে সে সম্ভবত সাবমেরিনের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে। সে নীলকান্তর লুকানো বটগাছটার দিকেই পা বাড়াল।
নীলকান্ত নিজের নিঃশ্বাস বন্ধ করে ফেললেন। হাতের লাঠি দিয়ে এই বন্দুকধারীর সাথে লড়াই জেতা সম্ভব নয়। লোকটা যখন গাছটার ঠিক এক হাত দূরত্বে এসে দাঁড়াল, ঠিক তখনই নীলকান্তর পায়ের নিচে একটা শুকনো ডাল ‘মট’ করে ভেঙে গেল।
জলদস্যুটা বিদ্যুৎগতিতে ঘুরে দাঁড়িয়ে রাইফেলটা সোজা নীলকান্তর বুকের দিকে তাক করল এবং ট্রিগারে আঙুল চেপে ধরল।
রাইফেলের ঘোড়াটা পিছন দিকে সরে গেল। ধাতব একটা ‘ক্লিক’ শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা গেল না। বৃষ্টির জলে বন্দুকের বারুদ ভিজে গেছে, গুলি ফুটল না! জলদস্যুটা মুহূর্তের জন্য ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। কিন্তু সে পাকা খুনি। রাইফেল কাজ না করতেই সে ওটা একপাশে ছুঁড়ে ফেলে কোমর থেকে চকচকে একটা ভারী ভোজালি বের করে আনল।
“মর এবার, শুয়োরের বাচ্চা!” তীব্র আক্রোশে চিৎকার করে সে নীলকান্তর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
নীলকান্ত তখন মরণপণ শক্তিতে নিজের হাতের লাঠিটা আড়াআড়ি তুলে ধরলেন। ভোজালির ধারালো ফালা এসে লাগল কাঠের ডালটায়। ‘কাচ’ করে এক শব্দে কাঁচা ডালটা দুভাগ হয়ে গেল। কিন্তু নীলকান্ত দমে গেলেন না। তিনি ভাঙা লাঠির সুচালো অংশটা দিয়ে জলদস্যুর পেটে এক সজোরে খোঁচা মারলেন। লোকটা যন্ত্রণায় একটা কুৎসিত শব্দ করে পিছিয়ে গেল, কিন্তু তার হাতের ভোজালি হাতছাড়া হলো না। বুনো জানোয়ারের মতো গোঙাতে গোঙাতে সে আবার তেড়ে এল।
পায়ে তীব্র জখম নিয়ে নীলকান্ত বেশি ক্ষণ এই মল্লযুদ্ধ চালাতে পারবেন না, তা তিনি ভালো করেই জানতেন। তিনি পিছু হটতে লাগলেন। চারপাশের স্যাঁতসেঁতে লতা আর ফার্নগাছগুলো যেন তাঁদের এই মরণখেলা দেখছে। হঠাৎ করেই নীলকান্তর পায়ের নিচের মাটি আলগা হয়ে গেল। কোনো বুনো লতা বা ঘাস নয়, বালি আর পচা পাতার এক ছদ্মবেশী আস্তরণ ছিল ওটা। এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশে পুরো মাটি ধসে গেল নিচের দিকে।
নীলকান্ত আর সেই জলদস্যু—দুজনই একসাথে ছিটকে পড়লেন এক অন্ধকার গহ্বরের ভেতর। ওপর থেকে টন টন মাটি আর পাথর তাঁদের ওপর ভেঙে পড়তে লাগল। এক অন্তহীন পতনের পর নীলকান্ত আছড়ে পড়লেন শক্ত পাথুরে মেঝের ওপর। পিঠের ব্যাগটা থাকায় মেরুদণ্ডটা বেঁচে গেল, কিন্তু ফুসফুসের সব হাওয়া এক লহমায় বেরিয়ে গেল।
চারপাশটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। ভ্যাপসা, গরম আর তীব্র গন্ধযুক্ত বাতাস। কানের কাছে ফোঁটা ফোঁটা জল পড়ার শব্দ হচ্ছে। নীলকান্ত কোনোমতে উঠে দাঁড়িয়ে হাতড়ে হাতড়ে নিজের ব্যাগের চেইনটা খুললেন। তাঁর জলনিরোধক দেশলাইয়ের বাক্স আর লণ্ঠনটা ভাগ্যিস ভাঙেনি। একটা কাঠি জ্বালতেই চারপাশটা মৃদু আলোয় ভেসে উঠল। লণ্ঠনটা জ্বালিয়ে তিনি যা দেখলেন, তাতে তাঁর শিরদাঁড়া দিয়ে একটি শীতল স্রোত বয়ে গেল।