আটলান্টিসের শেষ চাবি

নীলকান্ত গোলকটি নিজের হাত বের করলেন। সেটি এখন তীব্র আলোয় কাঁপছে। কিন্তু ঠিক তখনই পাতালপুরীর ওপরের ছাদ থেকে এক বিকট ফাটলের শব্দ হলো। সমুদ্রের জলের প্রচণ্ড চাপ এই বায়ু-কুঠুরিকে আর ধরে রাখতে পারছে না। স্ফটিকের স্তম্ভগুলোতে বড় বড় ফাটল দেখা দিতে শুরু করেছে।

“সময় নেই!” রক্ষী প্রধান চিৎকার করে উঠল। “তোরণ বন্ধ করতে হবে চিরকালের জন্য, নয়তো সমুদ্রের জল এই পুরো পাতালপুরীকে চূর্ণ করে ওপরে সুনামি ডেকে আনবে! কিন্তু চাবিটি তোরণে স্থাপন করতে হলে এমন একজনের প্রয়োজন, যার শরীরে এই সমুদ্রের নোনা রক্ত আর লড়াকু আত্মা আছে!”

নীলকান্ত খিলানের দিকে তাকালেন, যা রক্ষীদের ঠিক পেছনেই অবস্থিত। তিনি বুঝলেন, তাঁর জীবনের শেষ এবং সবচেয়ে বড় অ্যাডভেঞ্চারের মুহূর্তটি চলে এসেছে। ফিরে যাওয়ার কোনো পথ নেই, ওপরে চেনা পৃথিবী হয়তো ধ্বংসের মুখে। তিনি কি পারবেন নিজের জীবন বাজি রেখে এই আদিম তোরণকে চিরকালের জন্য সিল করে দিতে?

পাতালপুরীর স্ফটিকের ছাদটা যখন মড়মড় শব্দে ফেটে চৌচির হতে শুরু করল, তখন উপর থেকে সমুদ্রের কালো নোনা জল ধারায় ধারায় নিচে নামছে। একেকটি জলের ধারা যেন কোনো ইস্পাতের চাবুক, যা আছড়ে পড়ছে আটলান্টিসের প্রাচীন স্তম্ভগুলোর ওপর। রক্ষীদের নীলচে চামড়া কুয়াশা আর জলের ছিটায় চকচক করছে। তাদের চোখে এখন আর আদিম শ্রেষ্ঠত্বের অহংকার নেই, আছে এক আসন্ন মহাপ্রলয়ের আতঙ্ক।

“নীলকান্ত!” রক্ষী প্রধানের গম্ভীর কণ্ঠস্বর এবার জলপ্রপাতের গর্জনে ঢাকা পড়ে গেল। “আমাদের তোরণের শক্তি শেষ হয়ে আসছে। যদি এখনই চাবিটি মূল বেদির গভীরে লক করা না হয়, তবে এই বায়ু-কুঠুরি ফেটে যে শূন্যতার সৃষ্টি হবে, তা পুরো ভারত মহাসাগরকে এক করাল গ্রাসে গিলে খাবে। তোমার চেনা পৃথিবী তাসের ঘরের মতো তলিয়ে যাবে সমুদ্রের তলদেশে!”

নীলকান্ত নিজের ভাঙা বাম হাতটাকে একটা বুনো লতার টুকরো দিয়ে বুকের সাথে শক্ত করে বাঁধলেন। ডান কাঁধের ক্ষত থেকে অনবরত রক্ত ঝরছে, কিন্তু তাঁর স্নায়ু এখন সম্পূর্ণ শান্ত। একজন বিশ্বমানের ডুবুরি হিসেবে তিনি সমুদ্রের রুক্ষ ও সুন্দর রূপকে যেমন ভালোবেসেছেন, তেমনি তার এই সংহারক রূপের সামনে দাঁড়িয়ে মাথা নত করতেও পিছপা হননি। তিনি বুঝলেন, ১৮৮০ সালের এই দীর্ঘ যাত্রার শেষ স্টেশন এটাই। ইতিহাসের চাকা তাঁকে টেনে এনেছে চেনা পৃথিবীর সীমানার বাইরে, এই অমোঘ সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করাতে।

তিনি হাতের নীলকান্তমণি গোলকটি দিকে তাকালেন। সেটি এখন প্রগাঢ়, শান্ত এক আলোয় জ্বলছে। সেটি আর কোনো অপরাধ চক্রের চাবি নয়, ওটি এখন পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষার একমাত্র রক্ষাকবচ।

“আমি তৈরি,” নীলকান্ত বললেন। তাঁর কণ্ঠে ভয়ের কোনো লেশমাত্র ছিল না, ছিল এক পরম আত্মতৃপ্তি।

তিনি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এগিয়ে গেলেন মূল খিলানের দিকে। রক্ষীরা দুই পাশে সরে গিয়ে তাঁকে পথ করে দিল, তাদের দীর্ঘ মাথাগুলো নত হলো এক সাধারণ মানুষের দুঃসাহসের সামনে। খিলানের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এক জ্বলন্ত রূপালী গহ্বর, যা এই পাতালপুরীর মূল শক্তির উৎস। নীলকান্ত নিজের সুস্থ ডান হাত দিয়ে গোলকটি ধারণ করলেন এবং তাঁর নিজের তাজা রক্তের শেষ ফোঁটাগুলো গোলকের গায়ে মাখিয়ে দিলেন।

এক তীব্র চিৎকারে পুরো পাতালপুরী কেঁপে উঠল, যখন নীলকান্ত গোলকটি সেই রূপালী গহ্বরের ঠিক মাঝখানে সজোরে পুশ করলেন।

আপনার মন্তব্য জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top