নীলকান্ত নিজের রক্তাক্ত ডান হাতটি খিলানের ওপর চেপে ধরলেন। তাঁর নিজের তাজা রক্ত খিলানের গায়ে লেগে থাকা প্রাচীন খাঁজগুলোতে ছড়িয়ে পড়ল। সাথে সাথে পুরো খিলানটি এক ভয়ংকর লাল আভায় জ্বলে উঠল। গোলকটি নিজে থেকেই খিলানের গর্তের ভেতর সজোরে ঢুকে গেল।
পরমুহূর্তেই এক বিকট, কানফাটানো ধাতব শব্দ হলো। হ্রদের রূপালী জল তীব্র ঘূর্ণাবর্তের সৃষ্টি করে চারদিকে ছিটকে পড়তে লাগল। কিন্তু তোরণটি খোলার বদলে, চারপাশের কালো ধাতব দেয়ালগুলো হুড়মুড় করে ধসে পড়তে শুরু করল। নীলকান্ত প্রফেসরের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। চাবিটি ক্ষমতার তোরণ খোলেনি, খুলে দিয়েছে এক মহাবিনাশের পথ!
খিলানের ভেতর গোলকটি প্রবেশ করার সাথে সাথেই ভূগর্ভস্থ হ্রদের রূপালী পারদ-সদৃশ জল ওলটপালট হয়ে ওপরে উঠতে শুরু করল। পুরো পাতালকক্ষ জুড়ে এক কানফাটানো সাইরেনের মতো তীব্র শব্দ প্রতিধ্বনিত হতে লাগল, যা শত শত বছর ধরে এই আদিম তোরণের নিচে ঘুমিয়ে থাকা কোনো প্রাচীন স্বয়ংক্রিয় ধ্বংসযজ্ঞের সংকেত। চারপাশের কুচকুচে কালো ধাতব দেয়ালগুলো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে। বড় বড় পাথরের চাঁই এবং ধাতব চাদর হুড়মুড় করে আছড়ে পড়ছে ফুটন্ত জলের বুকে।
“এ তুমি কী করলে, নীলকান্ত! তোরণ খোলার বদলে সব ধ্বংস করে দিলে!” প্রফেসর সেনগুপ্ত পাগলের মতো চিৎকার করে উঠলেন। তাঁর হাতের রিভলভারটি কাঁপতে কাঁপতে মেঝেতে পড়ে গেল।
নীলকান্ত নিজের রক্তাক্ত কাঁধটা চেপে ধরে বেদির ওপর সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। চারপাশের ভ্যাপসা গরম আর অক্সিজেনের অভাব তাঁর ফুসফুসকে অবশ করে দিচ্ছে, কিন্তু তাঁর চোখে তখন এক অমোঘ সত্যের আলো। “আমি আগেই বলেছিলাম প্রফেসর, এই শক্তি মানুষের লোভের জন্য তৈরি হয়নি। আটলান্টিসের মানুষ তাদের নিজেদের ধ্বংসের ইতিহাস এই চাবির মধ্যে বন্দি করে রেখেছিল। আপনি ক্ষমতার তোরণ খুলতে চেয়েছিলেন, কিন্তু খুলে দিয়েছেন এই দ্বীপের নিচে থাকা আদিম আগ্নেয়গিরির মুখ!”
নীলকান্তর কথা শেষ হতে না হতেই হ্রদের মাঝখান থেকে রূপালী জলের বদলে এক তীব্র লাল রঙের লাভার স্রোত ফুঁসে উঠল। ম্যাগমার তীব্র উত্তাপে ভূগর্ভস্থ কক্ষের তাপমাত্রা এক লহমায় কয়েকশো ডিগ্রিতে পৌঁছে গেল। চামড়া পুড়ে যাওয়ার উপক্রম। বাতাস এতটাই বিষাক্ত গ্যাসে ভরে গেল যে এক সেকেন্ড শ্বাস নেওয়া মানেই নিশ্চিত মৃত্যু।
প্রফেসর সেনগুপ্ত নিজের ঝলসে যাওয়া মুখটা দুই হাতে চেপে ধরে আর্তনাদ করে উঠলেন। তাঁর পায়ের তলার মেঝেটি মাঝখান থেকে দুভাগে ফেটে গেল। লাভার একটি তীব্র শিখা এসে তাঁর শরীরকে গ্রাস করার আগেই তিনি ভারসাম্য হারিয়ে ছিটকে পড়লেন সেই ফুটন্ত রূপালী হ্রদের ভেতর। এক সেকেন্ডের জন্য তাঁর জলন্ত হাতটি ওপরে ওঠার চেষ্টা করল, তারপর চিরকালের জন্য লোহিত সাগরের এই পাতাল গহ্বরে তলিয়ে গেলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্রের সেই কুখ্যাত মস্তিস্ক।
নীলকান্ত আর পিছন ফিরে তাকানোর সময় পেলেন না। তাঁর নিজের পায়ের তলার বেদিটিও কাঁপছে। তিনি দেখলেন, সিঁড়িপথটি ইতিমধ্যেই ভেঙে পাথর দিয়ে বন্ধ হয়ে গেছে। ওপরে ওঠার কোনো পথ নেই। একমাত্র পথ হলো হ্রদের ওপারে থাকা একটি প্রকাণ্ড নিষ্কাশন পাইপ, যা দিয়ে লাভা আসার কারণে ভেতরের জল তীব্র বেগে বাইরের সমুদ্রের দিকে বেরিয়ে যাচ্ছে।