আটলান্টিসের শেষ চাবি

১৮৮০ সালের সেপ্টেম্বর মাস। ভারত মহাসাগরের বুক চিরে ধেয়ে আসছে এক প্রলয়ঙ্করী ঝড়। আকাশে মেঘের ঘনঘটা, যেন কোনো এক ক্রুদ্ধ দেবতা মহাবিশ্বের সব অন্ধকার ঢেলে দিয়েছেন এই চেনা সমুদ্রের ওপর। বাতাস ভারী, স্যাঁতসেঁতে আর দমচাপা গরমে চামড়া পুড়ে যাওয়ার উপক্রম। সমুদ্রের জল স্বাভাবিক নীল রঙ হারিয়ে আজ এক কুচকুচে কালো রূপ ধারণ করেছে। ঢেউয়ের উচ্চতা একেকটি পাহাড়ের মতো। সেই উত্তাল কৃষ্ণসমুদ্রের বুকে খড়কুটোর মতো কাঁপছে ‘দ্য সি-গাল’ নামের একটি ছোট বাষ্পচালিত জাহাজ। জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে আছেন নীলকান্ত। পরনে ভারী ডাইভিং স্যুট, মাথায় তামার তৈরি বিশাল হেলমেট। তাঁর চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে এক অদ্ভুত নেশায়। তিনি সাধারণ কোনো নাবিক নন, তিনি হলেন এই অঞ্চলের সবচেয়ে দুঃসাহসী ডুবুরি। সমুদ্রের অতল গভীরে লুকিয়ে থাকা প্রাচীন রহস্য টেনে বের করাই তাঁর পেশা এবং নেশা।

মেঘের ডাক আর সমুদ্রের গর্জনের মাঝেই জাহাজের ক্যাপ্টেন জন চিৎকার করে উঠলেন, “নীলকান্ত! ফিরে এসো! এই আবহাওয়ায় নিচে নামা মানে নিশ্চিত আত্মহত্যা! সমুদ্রের নিচে কারেন্ট খুব বেশি, তুমি টিকতে পারবে না!” নীলকান্ত ক্যাপ্টেনের দিকে তাকিয়ে শুধু একবার হাসলেন। তাঁর সেই হাসিতে ভয়ের কোনো চিহ্ন ছিল না, ছিল এক অমোঘ জেদ। তিনি ভালো করেই জানেন, আজ যদি তিনি নিচে না নামেন, তবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আবিষ্কারটি চিরকালের জন্য সমুদ্রের তলদেশে হারিয়ে যাবে। কয়েকদিন আগেই এক প্রাচীন আরব্য পাণ্ডুলিপিতে তিনি পেয়েছিলেন এই স্থানাঙ্ক। এখানে, এই ভারত মহাসাগরের ঠিক এই বিন্দুটির তিনশো ফুট নিচে ঘুমিয়ে আছে এক প্রাচীন ডুবোজাহাজ, যা সাধারণ কোনো জাহাজ নয়। এটি হলো শতাব্দীর সবচেয়ে বড় রহস্যের প্রবেশদ্বার।

নীলকান্ত নিজের ভারী হেলমেটের কাচটা আটকে দিলেন। পরমুহূর্তেই তিনি জাহাজের ডেক থেকে লাফিয়ে পড়লেন উত্তাল সমুদ্রের বুকে। ‘ছপাস’ শব্দটা মিলিয়ে গেল ঝড়ের গর্জনে। জলের ওপরের উত্তাপ আর বৃষ্টির দাপট নিমেষেই উধাও হয়ে গেল। চারপাশটা যেন এক লহমায় বদলে গেল নিস্তব্ধ, অন্ধকার আর হিমশীতল এক নরকে। নীলকান্তর কোমরে বাঁধা শক্ত দড়ি আর এয়ার পাইপ। ওপর থেকে পাম্পের সাহায্যে বাতাস পাঠানো হচ্ছে তাঁর হেলমেটের ভেতর। পিঠে বাঁধা লণ্ঠনের হালকা হলুদ আলো সমুদ্রের জমাট বাঁধা অন্ধকারকে চিরে পথ তৈরি করার চেষ্টা করছে। কিন্তু জলের নিচে আজ এক অদ্ভুত আলোড়ন। তীব্র স্রোত নীলকান্তকে খড়কুটোর মতো এদিক-ওদিক দোলাচ্ছে। পাথরের দেয়ালে ধাক্কা লাগলে তাঁর হাড়গোড় গুঁড়ো হয়ে যাবে, কিন্তু নীলকান্তর হাতদুটি শক্ত করে ধরে রেখেছে তাঁর কোমরে গোঁজা ধারালো ছোরা আর লণ্ঠনটি।

তিনি আরও নিচে নামতে লাগলেন। একশো ফুট, দুশো ফুট, আড়াইশো ফুট। কানের পর্দা ফেটে যাওয়ার উপক্রম হলো জলের প্রচণ্ড চাপে। ফুসফুসটা যেন সংকুচিত হয়ে আসছে। ঠিক তখনই লণ্ঠনের আলোয় ভেসে উঠল এক অতিপ্রাকৃতিক দৃশ্য। সমুদ্রের তলদেশের এক বিশাল বালির চড়ার ওপর কাত হয়ে পড়ে আছে এক দানবীয় আকৃতির প্রাচীন ডুবোজাহাজ। সাধারণ কাঠ বা লোহার তৈরি নয় এটি, এর গায়ে লেগে আছে এক অদ্ভুত তাম্রবর্ণের ধাতব আভা, যা শত শত বছর ধরে জলের নিচে থাকার পরও ক্ষয়ে যায়নি। জাহাজের গায়ে প্রাচীন কোনো লিপিতে কিছু খোদাই করা আছে, যা চেনা কোনো ভাষার সাথে মেলে না। নীলকান্তর হৃদস্পন্দন বেড়ে গেল। এটাই সেই অভিশপ্ত জাহাজ!

তিনি সাবধানে সাঁতরে জাহাজের ভাঙা কেবিনের ভেতরে ঢুকলেন। চারপাশটা শ্যাওলা আর সামুদ্রিক প্রাণীদের আস্তানা। ক্ষণে ক্ষণে প্রাচীন কাঠের টুকরো ভেঙে পড়ছে। সামান্য অসাবধানতায় এয়ার পাইপ কেটে গেলেই মৃত্যু

আপনার মন্তব্য জানান।

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top